আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই কাতারে বসবে ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। এর আগে রাজধানী দোহায় প্রবাসী শ্রমিকদের আবাসস্থ’ল থেকে উ’চ্ছেদ করতে শুরু করেছে দেশটির সরকার। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর প্রতিবে’দনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে দেশটিতে আসা পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করতে দোহার কেন্দ্রস্থলে অব’স্থিত অ্যাপার্টমেন্ট ব্ল’কগুলো খালি করছে কর্তৃপক্ষ।

উচ্ছেদের শি’কার শ্রমিকরা রয়’টার্স-কে জানিয়েছেন, কয়েক ডজন ভবন খা’লি করে তালা মেরে দিয়েছে মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃপ’ক্ষ। সেই স’ঙ্গে প্রবাসী শ্রমিক বিশেষ করে এশিয়ান ও আফ্রি’কানদের জো’র করে বের করে দেওয়া হয়েছে।

এমনকি তাদের থাকার জন্য বিক’ল্প কোনো ব্যব’স্থাও করা হয়নি। অনেকে বা’ধ্য হয়ে তা’লাব’দ্ধ বাড়িগুলোর সামনে বি’ছানা বিছিয়ে কোনোমতে রাত পার করেছেন। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ৪ সপ্তাহ আগে শ্রমিকদের সঙ্গে এমন আ’চরণ ক’রায় ফের স’মালোচনার মুখে প’ড়েছে কাতার।

 

এমনিতে শুরু থেকেই কাতার বিশ্বকাপ আছে নানা প্র’শ্নের মুখে। সবকিছুই প্রায় নতুন করে করতে হয়েছে তাদের, নির্মাণ হয়েছে বেশ কয়েকটি নতুন স্টেডিয়াম। এসব কাজে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শ্র’মিক মা’রা যাওয়ার অভি’যোগ রয়েছে। এছাড়া স’মকা’মীদের জন্য কাতারের আ’ইন নিয়েও রয়েছে স’মালোচনা। এবার তাতে যোগ হলো নতুন মাত্রা।

 

দোহার আল মানসুরা জেলায় সদ্য খা’লি করা হয়েছে এমন এক ভবনের বাসি’ন্দারা জানিয়েছেন, ওই ভবনে ১২ শ মানুষ থাকতেন। গত বুধবার রাতে হু’ট করে বাসিন্দাদের ভবন খালি করতে ২ ঘণ্টা সময় বেঁ’ধে দেয় মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃপ’ক্ষ। আড়াই ঘণ্টা পর মিউনিসিপ্যালিটির কর্মকর্তারা ফিরে আসেন এবং জো’র করে সবাইকে বাইরে বের করে দিয়ে দরজায় তা’লা মে’রে দেন।

 

বাসিন্দাদের দাবি, অনেকে সময়মতো ফিরে নিজেদের জিনিসপত্রও সরিয়ে নিতে পারেননি। উচ্ছেদের শিকার এক ব্যক্তি রয়টার্স-কে বলেছেন, ‘আমাদের যাওয়ার কোনো জায়’গা নেই। ‘ একথা বলার সময় ওই ব্যক্তি প্রায় ১০ জনের স’ঙ্গে বাড়ির বাইরে ঘুমানোর প্র’স্তুতি নিচ্ছিলেন।

 

তার সঙ্গে থাকা কারো কারো গায়ে শর’তের তা’প এবং আ’র্দ্রতার মাঝেও শার্ট পর্যন্ত ছিল না। তবে কর্তৃপক্ষের র’ক্তচ’ক্ষু এড়াতে তারা কেউ রয়টা’র্সকে নিজেদের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য দিতে অ’স্বীকার করেন। কাছেই পাঁচ ব্য’ক্তি একটি ম্যাট্রেস ও ছোট ফ্রিজ পিকআপ ট্র্যা’কে তুলছিলেন। তারা প্রতিবেদককে জানান, দোহা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত সুমায়সিমাহ এলাকায় একটি রুম খুঁজে পেয়েছেন।

 

এদিকে উচ্ছেদের ব্যাপারে জানতে চাইলে কাতারের সরকারি কর্মকর্তারা দা’বি করেছেন, বিশ্বকাপের সঙ্গে এর কোনো সম্প’র্ক নেই এবং দোহার এলাকাগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ। তাদের (যাদের উ’চ্ছেদ করা হয়েছে) নি’রাপদ ও সঠিক জায়গায় পুনর্বা’সন করা হয়েছে।

 

বিষয়টি নিয়ে ফিফা এবং কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজকদের প’ক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। কাতারের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ, যার ৮৫ শতাংশই প্রবা’সী শ্রমিক। উ’চ্ছে’দের শি’কার হওয়া শ্রমি’কদের অধিকাংশই ড্রাইভার কিংবা দিনম’জুর। এছাড়া যাদের সঙ্গে কোম্পা’নিগুলোর চু’ক্তি আছে ঠিকই কিন্তু থাকার ব্যবস্থা নিজের- এমন শ্রমিকদের এমন ভাগ্য বরণ করে নিতে হয়েছে।

 

তবে নির্মাণ সংস্থাগুলোতে যারা কাজ করেন তারা কোম্পানিগুলোর নিজ’স্ব ক্যাম্পে বসবাস করেন। এক শ্রমিক জানিয়েছেন, মূলত একক ব্যক্তি যারা তাদেরকেই উ’চ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু যে শ্রমি’করা পরিবারসহ বাস করেন তাদের উ’চ্ছে’দের শি’কার হতে হয়নি। রয়টার্স-এর প্রতিবে’দক বেশ কয়েকটি ভবনের বাসি’ন্দাদের সঙ্গে কথা বলে উ’চ্ছেদের ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। এমনকি কয়েকটি ভবনের বি’দ্যুত সংযোগও নাকি বিচ্ছি’ন্ন করা হয়েছে।

 

রয়টার্স-এর অনুস’ন্ধানে উঠে এসেছে, ওই ভবনগুলোর প্রায় সবগুলোই বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভাড়া নিয়েছে কাতারি সরকার। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে আল মানসুরা ও অন্যান্য জেলায় অবস্থিত অনেকগুলো ভবনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এই ভবনগুলোর একেকটি ফ্ল্যাটে ভাড়া প্রতি রাত ২৪০ থেকে ৪২৬ মার্কিন ড’লার নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

কাতার সরকারের পক্ষ থেকে রয়টার্স-কে জানানো হয়েছে, ২০১০ সালে পাস হওয়া একটি আই’ন বাস্তবায়ন করছে দোহা মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃপক্ষ। এই আইনে শ্রমি’কদের সপরিবার আবাসিক এলাকাগুলোতে বসবাস করতে বা’ধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি এই আই’নে অনাবাসী মানুষজনকে আবাসস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষ’মতাও দেওয়া হয়েছে।

 

উ’চ্ছেদের শি’কার শ্রমিকদের অনেকে তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকার জন্যই ওই ভবনগুলোকে বেছে নিয়েছিলেন। এখন উচ্ছেদ করার পর তাদের অনেকটা দূরে গিয়ে থাকার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে। অনেক শ্রমিক দা’বি করেছেন, তাদের একবার নয়, কয়েকবার উ’চ্ছেদের শি’কার হতে হয়েছে। তাদের একজন জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বরের শেষদিকে তাকে আল মানসুরার একটি ভবন ছাড়’তে বা’ধ্য করা হয়।

 

এর ১১ দিন পর কোনো পূর্ব নো’টিশ ছাড়াই তিনিসহ আরও ৪০০ জনকে পরবর্তী ভবন থেকেও বের করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশি প্রবাসী শ্র’মিক মোহাম্মদ জানিয়েছেন, একটি ভবনে ১৪ বছর ধরে বসবাস করছিলেন তিনি। কিন্তু গত বুধবার মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন তাকে সহ আরও ৩৮ জন বাসি’ন্দাকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁ’ধে দেয় বাড়ি ছাড়ার জন্য।

 

আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, যাদের অক্লা’ন্ত পরিশ্রমে কাতার বিশ্বকাপের বিভিন্ন অবকাঠা’মো নির্মাণ করা হলো, টুর্নামেন্টের সময় ঘনিয়ে আসতেই তাদেরকে ছু’ড়ে ফেলা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্টেডিয়ামগুলো কারা নির্মাণ করলো? রাস্তাঘাট কারা বানালো? সবকিছু কারা বা’নালো? বাঙালি, পাকিস্তানিরা। আমাদের মতো লো’কজন। এখন তারা আমাদের বাইরে বের করে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *